আমাদের দেশের প্রগতিশীল লোকেরা খুব দুশ্চিন্তায় সময় কাটান। কারণ দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। মাদরাসার সংখ্যা বাড়ছে, আলেমদের সংখ্যাও বাড়ছে। একজন আলেমের ইমামতি, মাদরাসায় পড়ানো, অন্যদের দীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা ইত্যাদি তাদের দৃষ্টিতে কোনো প্রোডাকটিভ কাজ নয়। তাদের দৃষ্টিতে এসব কাজ যারা করেন তারা সমাজের অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণি। তারা ভাবেন এদের ভবিষ্যতের কথা। কীভাবে এসব বেকার আলেমদেরকে হাতের কাজ শেখানো যায়, কিংবা মাদরাসায় ইংরেজি ও বিজ্ঞান পড়িয়ে তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরানো যায়।

 

কিন্তু আসলে একজন ইমামের ইমামতির দায়িত্ব কি এতই সহজ? পাঁচ ওয়াক্ত ঠিক সময়ে একই মসজিদে হাজির থাকা কতটা কঠিন তা নিজে পরীক্ষা না করলে কেউ বুঝবে না। মাদরাসায় পড়ানোও কি খুব সহজ কাজ? একজন সত্যিকার শিক্ষক হক আদায় করে শিক্ষকতা করতে চাইলে এর বাইরে কতটুকু সময় বের করতে পারবেন?

 

আলেমদের নিয়ে আরেক দল লোকও বেশ চিন্তিত। তারা মূলত আলেমদের কল্যাণকামী। কেউ কেউ নিজেও আলেম বা তালিবে ইলম। বর্তমানে সারা দুনিয়া বইছে স্পেশালাইজেশনের দিকে, সেখানে তাদের চিন্তা চলছে এর ঠিক একশ আশি ডিগ্রি উল্টো দিকে। তারা এখনও স্বপ্ন দেখছেন আলেমদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর। তারা চান সব আলেম বিজ্ঞানী হয়ে নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করবেন কিংবা নতুন কোনো গাড়ি বা উড়োজাহাজ বানাবেন। কিন্তু আসলে কি এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব? ইবনে সীনা কি কোনো তাফসির লিখেছেন? নাকি ইমাম বুখারী ওষুধের কিতাব লিখেছেন?

 

একজন প্রজ্ঞাবান আলেম কখনও একজন বিজ্ঞ ও সৎ ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার সম্বন্ধে এই মন্তব্য করতে পারেন না যে, “এরা তো দুনিয়ার কুকুর।” কোনো উপকারী ইলমকে বা কোনো উপকারী ইলমের ধারক-বাহককে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা কোন আলেমের আদর্শ নয়। ইসলামও আমাদের এমনটাই শিক্ষা দেয়।

 

এখন প্রশ্ন হলো, ইংরেজি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি-এসব কি মাদরাসায় পড়ানোর প্রয়োজন নাই? এর উত্তরে আমি বলব, অবশ্যই আছে।  তার পরের প্রশ্ন, কতটুকু বিজ্ঞান ও কতটুকু ইংরেজি আলেমদের শিখতে হবে? এর উত্তর হলো, যতটুকু না হলেই নয়। যাতে একজন আলেম বাংলা ভাষায় শুদ্ধভাবে বলতে, লিখতে পারেন। প্রতিদিনের কাজ চালাতে যতটুকু ইংরেজি প্রয়োজন তার জ্ঞান রাখেন। জীবন চলার পথে প্রয়োজনীয় অঙ্ক নিজেই কষতে পারেন।  বিজ্ঞান-রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞ না থাকেন। এর বেশি হলে সেটি ব্যক্তির আগ্রহ বা বিশেষায়নের বিষয়।  আমার মতে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত থাকা বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, পৌরনীতি-এসবের সবটুকুই মাদরাসার সিলেবাসে থাকা উচিত। তবে এসব বিষয়ের সবটুকু প্রাথমিক স্তরে পড়ে শেষ করার দরকার নেই। বরং অনেকগুলো বিষয় মাধ্যমিক স্তরে থাকতে পারে।

 

আট বছরের দাওরা কোর্সে নতুন করে এসব বিষয় কোনোভাবেই  ঢোকানোর পক্ষে আমি নই। এসব করার জন্য আগে দরকার ষোল বছর মেয়াদি পরিপূর্ণ কোর্স। সরকারের কাছে না হলেও, সারা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদের কাছে এর প্রতিটি স্তরের আলাদা মূল্যায়ন থাকতে হবে। যাতে মসজিদের খতীব, পেশ ইমাম, সানী ইমাম, মুআযযিন, খাদেম, ঝাড়ুদার সবার শিক্ষাগত যোগ্যতা সমান না হয়ে যায়।

 

ঠিক একইভাবে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদেরকে ফকিহ-মুজতাহিদ আলেম বানানোর চিন্তাটাও স্বাভাবিক কোনো চিন্তা নয়। তাদেরও নিজের বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য অনেক সময় ব্যয় করা প্রয়োজন। তাই তাদের কেবল দীনের জরুরি বিষয়গুলোই শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। যাতে একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারও শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারেন। ছোট বিশটি সুরা তার মুখস্থ থাকতে হবে। ইসলামের মৌলিক আকীদা বা বিশ্বাসসমূহ তার অজানা থাকবে না।  নামাজ, রোজা, যাকাতের বড় বড় মাসআলাগুলো তার জানা থাকে। হালাল-হারামের সীমা তার কাছে স্পষ্ট থাকে। এর চেয়ে বেশি কেবল সেই শিখবে যার তাতে ব্যক্তিগত আগ্রহ আছে।

 

আমরা যদি চাই যে, সমাজের সর্বস্তরে, অফিস-আদালতে আমাদের নিজেদের লোক থাকুক, তবে সময় এসেছে মাদরাসার সিলেবাসকে জগাখিচুড়ি না বানিয়ে, নিজেদের মতো করে স্কুল, কলেজ, আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা।  সবচেয়ে বড় কথা এই কাজ করতে কোন মুরুব্বী আমাদের বাঁধা দিতে আসছেন না।

 

আসলে উপরে যে হাইপোথিসিস দাঁড় করালাম এটা আমার এলোমেলো চিন্তার ফসল। কাউকে আঘাত দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়।