প্রায় সময়ই আমরা কওমী মাদরাসার কার্যকর স্বীকৃতির বিষয়ে আওয়াজ তুলি। কিন্তু বাস্তবতা হলো স্বীকৃতির এই রাস্তাটা মোটেও সুগম নয়। নানাবিধ বাধা রয়েছে। যতদিন পর্যন্ত স্বীকৃতি না পাওয়া যায়, ততদিন কাজ চালানোর মতো একটি ব্যবস্থা আমার মাথায় অনেক দিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের ধরন

প্রথমত, একটি বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা, যাতে স্কুল বা আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস পড়ানো হবে। পরিচালিত হবে কওমী মাদরাসার আদর্শে। 

প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য

এমন কিছু দক্ষ লোকবল তৈরি করা যারা ইসলামের আদর্শে দিক্ষিত হবে। যারা সমাজের মানুষের সাথে মিশে তাদের মাঝে ইসলামের আদর্শ ছড়িয়ে দিবে। এটি কখনই মাদরাসার বিকল্প নয়, বরং প্রচলিত স্কুল ও কলেজের বিকল্প।

প্রতিষ্ঠানে ভর্তির যোগ্যতা

  • ভালো হাফেজ হওয়া

  • কাফিয়া পর্যন্ত সব ক্লাসে মুমতাজ হওয়া

  • বয়স ষোল বছরের বেশি না হওয়া

  • পড়াশোনা করার অন্য ঝামেলা বা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া

  • হোস্টেলে আবাসিক থাকা

শিক্ষার খরচ

ছাত্ররা নিজেদের ব্যয় নিজেরাই বহন করবে অথবা তাদের পূর্ণ বা আংশিক স্কলারশিপ দেওয়া হবে। যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো আর্থিক দায়িত্ব বা চাপ না থাকে।

শিক্ষকবৃন্দের যোগ্যতা

শিক্ষক হবেন তারাই যারা কওমী মাদরাসায় পড়াশোনা করেছেন এবং কওমী মাদরাসার আদর্শ নিজেদের মাঝে লালন করেন। উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিলে এ ধরনের শিক্ষকের অভাব হবে না, ইনশাআল্লাহ।

শিক্ষাস্তর

প্রাথমিক: 

যেহেতু ছাত্ররা মেধাবী ও বেশ কিছুটা বোধসম্পন্ন হবে, তাই তাদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এক বছর যথেষ্ট হবে বলে আশা করা যায়। কারণ তারা কওমী মাদরাসায় কাফিয়া পর্যন্ত পড়লে সেখানে তাদের বাংলা, গণিত, ইংরেজির প্রাথমিক জ্ঞান থাকবে।

নিম্ন মাধ্যমিক:

তারপর তারা নিয়মমতো ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি পড়ে জেএসসি পরীক্ষা দেবে। ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানের ওপর তাদের বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হবে।

মাধ্যমিক:

তারপর নবম ও দশম শ্রেণিও নিয়মমাফিক পড়বে। আমার হিসেবে মানবিক বিভাগে ছাত্র না পাঠানোই উত্তম। কেবল বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছাত্রদের পড়ানো যেতে পারে।

 উচ্চমাধ্যমিক:

একইভাবে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিও তাদের নিয়মমাফিক পড়ানো হবে ও তারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাতেও অংশ গ্রহণ করবে। 

মোট সময়

এতে মোট সময় লাগবে আট বছর। যদি একজন ছাত্র ষোল বছর বয়সে ভর্তি হয়ে থাকে তাহলে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার পর তার বয়স হবে চব্বিশ বছর। যদি এর চেয়ে বেশি তাড়াহুড়ো করা হয় তাহলে আধুনিক বিষয়গুলোতে ছাত্রদের  ভিত্তি দুর্বল থাকবে। পরিণামে তারা মেডিক্যাল বা বুয়েটে ভর্তির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

কাফিয়া পর্যন্ত পড়তে কত দিন লাগবে

নূরানী এক বছর, নাযেরা এক বছর, হিফজ তিন বছর। মোট পাঁচ বছর। তারপর ইবতিদাইয়্যাহ, মিযান, নাহবেমী, হেদায়াতুন্নাহব, কাফিয়া-প্রতিটি এক বছর করে মোট পাঁচ বছর। এই হলো মোট দশ বছর। একজন ছাত্র ছয় বছর বয়সে পড়াশোনা শুরু করলে কাফিয়া পর্যন্ত পড়ে শেষ করার পর তার বয়স থাকবে ষোল।

গুণগত মান

আমাদের ছাত্ররা আলিয়াতে পরীক্ষা দিয়ে এ প্লাস ঠিকই পাচ্ছে। কিন্তু তাদের মাঝে কাঙ্খিত যোগ্যতা মোটেও তৈরি হচ্ছে না। অধিকাংশ মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্র কামিল কিংবা পাবলিক ভার্সিটিতে ইসলামিক স্টাডিজ শেষ করেও বিসিএস ক্যাডার হতে পারছে না। অথচ কওমী মাদরাসার ছাত্রদের মেধা বা পরিশ্রমের তুলনায় হাজারে একজনের ক্যাডার হওয়াটা কিছুই না। কওমী মাদরাসা থেকে যারা আলিয়াতে পরীক্ষা দেয় তাদের সিংহভাগের পড়াশোনার মাঝে ছেদ পড়ে। খুব কম ছাত্রই আলিয়াতে পরীক্ষা দিয়ে কওমী ও আলিয়া মাদরাসা উভয়টির কাংক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।

ফলাফল

একজন ছাত্র এরপর চাইলে যেকোন ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। বিসিএস ক্যাডারও হতে পারবে। চাইলে ইসলামিক বা অন্য কোনো বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও যেতে পারবে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইসলামিক শিক্ষার শিক্ষিত ব্যক্তিরা কওমী মাদরাসার প্রতিনিধিত্ব করবে। সমাজের মাঝে কিছুটা হলেও ইসলামের সুবাস ছড়িয়ে পড়বে।

আমার আশা

যদি কোন যোগ্য ব্যক্তি এমন কোন প্রতিষ্ঠান চালু করেন, তাহলে ছাত্ররা তার দিকে ঝাপিয়ে পড়বে। বিশেষ করে সেসব অভিভাবক যারা সন্তানকে দ্বীন ও দুনিয়ার উভয় ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান। স্বপ্ন দেখতে তো কোন বাধা নেই। হয়ত কোন একদিন এমন প্রতিষ্ঠান প্রতি জেলাতেই থাকবে।