কেউ যখন সন্তানের জন্য আনকমন নাম খুঁজেন তখন আমি খুবই বিরক্ত হই। এবং কারও আনকমন নামের অর্থ বের করা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর একটি কাজ মনে হয়। আমার মা-বাবার দেওয়া নামটি নিয়ে কি পরিমাণ পেরেশানি পোহাতে হয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। না জানি আর কত মুসিবত সামনে আছে?

বাংলাদেশে পাসপোর্ট রিনিউ

প্রথমত: বাংলাদেশের এন আই ডি কার্ড। টাইপিস্টের দোষ দেব না, মিয়াদাদ নামটি হয়তো সে বাপের জনমে শোনেনি। তাই হয়তো তার মাথা হ্যাং হয়ে গিয়েছিল।  ফলে Miadad বানান ঠিক লিখলেও সহজ Haque বানানে Hoque লিখে।  তারপর প্রায় দশ বছর এভাবেই কাটে। তখন মাদরাসায় পড়েছি বলে সম্ভবত কোনো ঝামেলা হয়নি। কারণ আমার সব সার্টিফিকেটে Haque লেখা আছে। তারপর ২০১৮ সালে পাসপোর্ট করি। তাড়াহুড়ো ছিল, তাই এন আই ডি সংশোধনের সময় ছিল না। 

২০২১ সালে যখন মক্কা আসার জন্য পাসপোর্ট করি, তখন বিভিন্ন কারণে নামটি সার্টিফিকেটের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা দরকার ছিল। তাই সবার আগে আমার এন আই ডি-তে থাকা ভুল সংশোধন করি। তারপর পাসপোর্ট নবায়ন করার জন্য আবেদন করি। এই কাজটি যেন ছিল বিশাল বড় মহাকবিরা গুনাহ। এর জন্য অনেক প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই আমার নাক আর চোখের পানি এক করে ফেলেছিলো। কী কী মুসিবত তখন আমার সইতে হয়েছিল আর কোথায় কোথায় আমাকে দৌড়াতে হয়েছিল তার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস বা তার চেয়ে বেশি দিনের চেষ্টায় ও বেশ কয়েক হাজার টাকা খরচে তা ঠিক হয়েছিল। আমি তখন পানির মতো টাকা খরচ করতেও প্রস্তুত ছিলাম।

 

ইকামায় বানান ভুল

দ্বিতীয়ত: সৌদি আরবে এসে দেখি আরও বড় সারপ্রাইজ। প্রথমেই আমার ইকামায় ইংরেজি নাম ঠিক থাকলেও আরবী নামে বিশাল ব্যবধান। মিয়াদাদ হক-কে তারা লিখেছিল মীদা আকী (ميدا أكي)। আমার মাকতাবে আমেলের বড় ভাইকে বললাম, ভাই নামে তো ভুল। বললেন, চলতে থাকুন। আমিও চলতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। 

 

ভুলের উপর ভুল

তৃতীয়ত: তার প্রায় চার মাস পর কুল্লিয়াতুল হারামে ভর্তি হলাম। তারা করলো আরেক ভুল। মীদা আকী-কে তারা বানালো মীদ আকরা (ميد أكر)। প্রথমবার স্টাইপেন্ড আনার সময় অফিসের লোকেরা এই ব্যবধান ধরে ফেলল। বলল, সাবধান আরেকবার স্টাইপেন্ড আসার আগেই সংশোধন করে নিবে। তারপর ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা আসার তেমন ঝামেলা হয়নি। তবে সেই মীদ আকরা-কে মীদা আকী বানাতে আমার দুই বছরের বেশি সময় লেগেছিল। 

 

ব্যাংকের অফিসারের মর্জি

চতুর্থত: বিবাহিত ছাত্রদের প্রতি ছয় মাসে পাঁচ হাজার রিয়াল ভাতা দেওয়া হতো। এটা দেওয়া হতো চেকের মাধ্যমে। একদিন খুব তাড়াহুড়োর মাঝে আমি ব্যাংকে গেলাম। ব্যাংকের কর্মচারীর কোনো একটা কাজে আমি খুব বিনয়ের সাথে প্রতিবাদ করি। তারপর তিনি আমার উপর তার ঝাল মেটালেন। তাকে আমি দোষ দেব না, কারণ টেকনিক্যালি তিনি ঠিক ছিলেন। গম্ভীর কণ্ঠে তিনি বললেন,

 الاسم الإنجليزي مو كويس-

-ইংরেজি নামটি ঠিক না। কারণ ইংরেজিতে মিয়াদাদ হক আরবীতে মীদা আকী। খুবই ভদ্রভাবে বললেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইংরেজি ও আরবী নাম এক করে নিয়ে আসুন। আমার মাথায় আসমান ভেঙে পড়ল, কারণ টাকাটা ঠিক সেই মুহূর্তেই দরকার ছিল।  তারপর ঠাণ্ডা মাথায় সেই ব্যাংক আল বিলাদের আরেকটি শাখায় যাই এবং টাকাটি তুলতে সক্ষম হই। 

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসার

পঞ্চমত: তারপর মাথায় খেলতে থাকলো কিভাবে আমার নামটি সংশোধন করা যায়। কারণ নাম সংশোধন করা অনেক ঝামেলার কোনো কাজ বলেই জেনেছি। আমার বিভাগীয় প্রধান ডক্টর হানী আস সুওয়াইহিরি এক দিন বিষয়টি জেনে বললেন, সার্টিফিকেট আসার আগেই নামটি ঠিক করে নিও। তখন অনার্সের ফাইনাল ইয়ার চলছিল। একদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। কী মনে করে পাশে থাকা কম্পিউটারের দোকানগুলোর একটায় ঢুকলাম। বললাম আমি নাম ঠিক করতে চাই। এক রোহিঙ্গা ভাই, আবেদন করার ব্যবস্থা করে দিলেন। ত্রিশ রিয়াল রাখলেন। আর বললেন, আপনি হুজুর মানুষ। তারা হুজুর মানুষ দেখলে দয়া করে দিয়ে দেয়। ট্রাই করে দেখুন। 

আমার সাথে পাসপোর্টও। কোনো প্রস্তুতিও ছিলো না। শেষতক ঢুকলাম। সিরিয়ালে দাঁড়ালাম। এক  দশাসই আর্মি অফিসার আমার বিষয়টি জানতে চাইল। বলল, পাসপোর্ট? আমি পিডিএফ কপি দেখালাম। তারপর বলল, ইকামার ফটোকপি। আমার নিজের বিশেষ সাইজে প্রিন্ট করা কপি দিলাম। বলল, সবার ইকামা ছোট আপনারটা এত বড় কেন? বোকার মত হাসলাম। তারপর বলল, তোমার মূল ইকামা দাও। দিলাম। বলল, অপেক্ষা করুন। পাঁচ-সাত মিনিট ভদ্রলোক আমার পরের সিরিয়ালের লোকদের সাথে কথা বললেন। তারপর এক সময় আমাকে ডেকে ঝকঝকে একটি নতুন ও সংশোধিত ইকামা দিয়ে দিলেন। এই দিনটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম খুশির দিন। তারপর অনার্সের সার্টিফিকেট সংশোধিত নামে হাতে আসল। 

 

হাসপাতালের নতুন নাম

ষষ্ঠত: শরীরের সাইজ বিশাল হলেও, আমি রোগা মানুষ। মক্কার বিভিন্ন হাসপাতালের করিডোরের প্রতিটি টাইলসে আমার পদধূলি রয়েছে। নাম সংশোধিত হওয়ার খুশিতে আমি হাসপাতালের রিসেপশনে থাকা ভদ্র মহিলাকে বললাম, ম্যাডাম আমার নামটি ঠিক করে দিলে ভালো হতো। ম্যাডামকে অনেক কষ্টে বুঝালাম বিষয়টি। তিনি অনেক কষ্ট করে নামটি ঠিক করে দিলেন। তাকে আল্লাহ তাআলা উত্তম বদলা দিন। এসে দেখি তিনি লিখেছেন, Miadad Akhi - মিয়াদাদ আখি। এখন হাসপাতালের খাতায় আমি মিয়াদাদ আখি হিসেবে আছি। কে জানে, মিয়াদাদ আখি নামেই কি দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয় কিনা।

ব্যাংকে নতুন পেরেশানি

সপ্তমত: ইকামা রিনিউ হয়েছে তিন মাস আগে। তখন থেকে আল রাজহী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট আপডেট করার চেষ্টা করেছি। কাজ হয়নি। গত দুদিন আগে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। এমন আগেও হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকে গেলেই তা কয়েক মিনিটেই আপডেট করে দিয়েছিল। এবারও গেলাম। ভদ্র লোক বললেন, তোমার ইকামা তো রিনিউ হয়নি। আমি আসমান থেকে পড়লাম। ইকামা দেখালাম। বলল, আমাদের ব্যাংকে তোমার অ্যাকাউন্ট আরবী খোলা হয়েছে। এখানে তোমার আগের নাম মীদা আকী লিখা আছে। মীদা আকীর তো ইকামা রিনিউ হয়নি, মিয়াদাদ হকের ইকামা রিনিউ হয়েছে। জানতে চাইলাম করণীয় কী? বললেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সব কাগজপত্র নিয়ে যান। এই মুহূর্তে এই অ্যাকাউন্টটির খুব দরকার ছিল। হয়তো নতুন মুসিবতে পড়ব।

ব্যাংক থেকে বের হয়ে এসে হাতে থাকার কাগজগুলোতে দুমড়ে-মুচড়ে ফেললাম। যা আমার স্বভাববিরুদ্ধ একটি কাজ। যারা নিজেদের সন্তানের জন্য আনকমন নাম খুঁজেন তারা আরেকবার ভেবে নিয়েন।