মক্কার ব্যস্ত সড়ক, উঁচু ভবন আর গাড়ির অবিরাম কোলাহলের ভেতরেই আজও টিকে আছে একটা প্রাচীন কবরস্থান, যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হিজরতের এক মর্মস্পর্শী ঘটনা। মাকবারাতুল মুহাজিরীন—মুহাজিরদের কবরস্থান—মক্কার ‘আল যাহির’ এলাকার হাসহাসে অবস্থিত, বর্তমানে যা পরিচিত আল-মুখতালা নামে। জায়গাটির প্রাচীন নাম ছিল ‘আযাত বনি গিফার’, আর এই নামেই একে চিনতেন আযরাকী ও ফাকিহীর মতো মক্কার সবচেয়ে পুরনো ঐতিহাসিকেরা। তাঁদের গ্রন্থ থেকে শুরু করে সৌদি আরবের কিং আবদুল আজিজ পাবলিক লাইব্রেরির বিশ্বকোষ পর্যন্ত—শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জায়গাটি সুনির্দিষ্টভাবেই চিহ্নিত হয়ে আছে, আজও মক্কার বুকে এটি একটি সুস্পষ্ট, শনাক্তযোগ্য ভূখণ্ড।

এই ‘আযাত বনি গিফার’ আরেকটি অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী। এখানেই একদিন জিবরাঈল (আ.) নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে সুসংবাদ দিয়েছিলেন—আল্লাহ উম্মতের সুবিধার্থে কুরআন সাত ধরনের পাঠে (হরফে) তিলাওয়াতের অনুমতি দিয়েছেন, প্রতিটিই যথেষ্ট ও পরিপূর্ণ। তবে এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে মর্মস্পর্শী গল্পটি ভিন্ন এক মানুষের—যাঁর হিজরতের চেষ্টা থেমে গিয়েছিল এই পথেই।

'মুহাজির' মানে যিনি আল্লাহর পথে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে হিজরত করেন। এই কবরস্থানের নামের পেছনেও আছে তেমনই এক মানুষের গল্প। ইতিহাসে তাঁর নাম এসেছে দু-এক রকমভাবে—জুনদুব ইবন দমরা, কোথাও উল্টো ক্রমে দমরা ইবন জুনদুব—তবে অধিকাংশ সীরাত ও তাফসিরগ্রন্থে তিনি পরিচিত জুনদুব ইবন দমরা নামে। বয়সের ভারে আর অসুস্থতায় তিনি তখনও মক্কাতেই ছিলেন, কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত মদিনায়, নবীজি (সা.)-এর সান্নিধ্যে। তিনি হিজরত করেননি। এটা ছিল তার আফসোস। হিজরত করা ছাড়া তিনি দুনিয়া থেকে চলে যাবেন-তার মন এটা কখনই মেনে নিচ্ছিল না। মুমূর্ষ অবস্থায় তিনি সন্তানদের বললেন, তাঁকে যেন মক্কা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়, তিনি আর এক রাতও এই শহরে কাটাতে চান না। সন্তানেরা বৃদ্ধ পিতাকে বহন করে যাত্রা শুরু করলেন মদিনার পথে।

কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানো হলো না তাঁর। মক্কা থেকে মদিনার দিকে যাত্রাপথে, হাসহাসে পৌঁছাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। ইবনুল আসিরের উসদুল গাবা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, এর কিছুদিন আগে যখন হিজরতে অবহেলা না করার আয়াত নাজিল হয়, তখন তিনি বলে উঠেছিলেন, "হে আল্লাহ, তুমি ওজর ও দলিল পৌঁছে দিয়েছ, আমার আর কোনো ওজর-দলিল নেই।" এরপর বার্ধক্যেই বেরিয়ে পড়েন, আর পথেই তাঁর সফর শেষ হয়।

ইতিহাস ও সীরাতের কিতাবে বলা হয়, এই ঘটনার পরই সাহাবিদের মনে প্রশ্ন জাগে—হিজরত সম্পূর্ণ না করেই যিনি মারা গেলেন, তিনি কি পূর্ণ প্রতিদান পাবেন? তখনই নাজিল হয় সূরা নিসার ১০০ নম্বর আয়াত—যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে হিজরত করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান নিশ্চিত হয়ে যায়। জুনদুব ইবন দমরার এই ঘটনা ঘিরেই কবরস্থানটি পরিচিতি পায় মুহাজিরদের কবরস্থান নামে। ইতিহাসের নথি এ-ও বলে, তাঁর মতো পরিণতি আরও কারও কারও হয়েছিল—হিজরতের পথে বেরিয়ে মৃত্যুবরণ করা এই মানুষগুলো একে একে ঠাঁই পেয়েছেন একই ভূমিতে। তাই কবরস্থানের নামটাও বহুবচনে—মুহাজিরীন, শুধু একজন মুহাজির নয়।

সময়ের সঙ্গে মক্কার চেহারা বদলেছে। কবরস্থানটির মধ্য দিয়ে একদিন রাস্তা তৈরি হয়েছে, চারপাশ ঘিরে উঠেছে দালানকোঠা। আজ একে দেখা যায় নিচু ইটের দেয়ালে ঘেরা অবস্থায়, নতুন কোনো দাফন আর হয় না এখানে। তবু চারপাশের এই আধুনিক পরিবর্তনের ভিড়েও জায়গাটা হারিয়ে যায়নি—আজও এটি মক্কার একটি সুনির্দিষ্ট, চিহ্নিত ভূখণ্ড হিসেবেই টিকে আছে, মাটির নিচে চাপা পড়েনি এর গল্পটাও।

আজ মক্কায় তাকালে চোখে পড়ে বিশাল সড়ক আর আধুনিক স্থাপনা। তার মাঝেই এই ছোট্ট কবরস্থান যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে দেয়। এখানে শায়িত মানুষের সব পরিচয় নিশ্চিত নয়, অনেক কবরের নামও হারিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়। তবু স্থানটির নামই বলে দেয় তার গল্প—মুহাজিরীন। শতাব্দী পেরিয়েও তা মনে করিয়ে দেয়, হিজরত মানে শুধু এক শহর থেকে আরেক শহরে পৌঁছানো নয়; হিজরত হলো আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়ার সেই সিদ্ধান্ত, যার প্রতিদান নির্ভর করে না গন্তব্যে পৌঁছানোর ওপর।