মরুর নীরব প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা এক কূপ, যার নামে জড়িয়ে আছে বরকত আর প্রচলিত এক অলৌকিকতার কাহিন

মদিনা মুনাওয়ারা থেকে বদরের দিকে এগোলে পথে পড়ে আল-রাওহা নামের একটি ঐতিহাসিক জনপদ। মক্কা-মদিনার মধ্যবর্তী এই অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই পথিক ও কাফেলার বিশ্রামস্থল হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে এখানকার একটি কূপকে বলা হয় 'বিরে শিফা', তবে ঐতিহাসিক সূত্রে এই কূপের পরিচয় পাওয়া যায় 'বিরে রাওহা' (بئر الروحاء) ও 'সাজসাজ' (سجسج) নামে। আধুনিক প্রচলিত 'বিরে শিফা' নামটি এই ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে ঠিক কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

বদরের পথে এক ঐতিহাসিক জনপদ

বদর—ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। ২ হিজরির ১৭ রমজান সংঘটিত এই যুদ্ধে সংখ্যায় অল্প হয়েও মুসলিমরা আল্লাহর সাহায্যে অর্জন করেন এক ঐতিহাসিক বিজয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—

وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ "আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের বদরে সাহায্য করেছিলেন, যখন তোমরা ছিলে দুর্বল। অতএব, আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।" —সূরা আলে ইমরান: ১২৩

বদরের পথে আল-রাওহা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্রামস্থল। সীরাতগ্রন্থে এসেছে, বদর অভিযানের পথে রাসুলুল্লাহ ﷺ সাজসাজে অবতরণ করেছিলেন, যা বিরে রাওহা নামেই পরিচিত ছিল; এরপর সেখান থেকে যাত্রা করে তিনি বদরের দিকে অগ্রসর হন। তবে আজকের 'বিরে শিফা' নামে পরিচিত কূপটি সেই ঐতিহাসিক কূপের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

'শিফা' নামের আড়ালে এক জনশ্রুতি

আরবি 'বির' অর্থ কূপ, আর 'শিফা' অর্থ আরোগ্য বা নিরাময়। ইসলামী বিশ্বাসে রোগমুক্তির প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা—পবিত্র কোরআনে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই অমর উপলব্ধি উঠে এসেছে—

وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ "আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।" —সূরা আশ-শুআরা: ৮০

এই কূপকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে একটি বর্ণনা প্রচলিত: কোনো এক সময় এর পানি ছিল অত্যন্ত লবণাক্ত ও পানের অনুপযোগী, পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মোবারক লু'আব পানিতে পড়ার পর তা সুপেয় ও মিষ্টি হয়ে যায়—আর সেই থেকেই নাকি এর নাম হয় 'বিরে শিফা'। তবে এই বর্ণনার পক্ষে সহিহ ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের প্রমাণ নেই; তাই একে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত মুজিজা না বলে প্রচলিত জনশ্রুতি হিসেবে দেখাই বেশি যথাযথ ও দায়িত্বশীল।

প্রকৃত শিফার উৎস

পবিত্র কোরআন মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ "আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।" —সূরা আল-ইসরা: ৮২

কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও রুকইয়াহ ইসলামে স্বীকৃত বরকতময় আমল—সূরা ফাতিহার মাধ্যমে রুকইয়ার ঘটনা সহিহ হাদিসে সুপ্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে অসুস্থতায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ও ওষুধ সেবন করাও ইসলামী শিক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করতেন—

اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَأْسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا "হে মানুষের রব আল্লাহ! কষ্ট দূর করে দিন। আপনি আরোগ্য দান করুন, আপনিই আরোগ্যদাতা। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই—এমন আরোগ্য দান করুন, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।" —সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

কূপের পানি নয়, শিক্ষা হোক ঈমানের

বিরে শিফার সামনে দাঁড়ালে একজন মুসলিমের মনে শুধু একটি প্রাচীন কূপের কথা নয়, বরং আল্লাহর কুদরত, নবীজি ﷺ-এর যুগের স্মৃতি আর বদরের সুমহান প্রেক্ষাপট জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক। তবে কোনো স্থানের পানি বা মাটি নিজস্বভাবে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নয়; একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহ চাইলে সাধারণ একটি মাধ্যমের মধ্য দিয়েও শিফা দিতে পারেন, আবার কোনো মাধ্যম ছাড়াই দিতে পারেন।

মরুর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই কূপ তাই কেবল একটি জলাধার নয়—ইতিহাসের স্মৃতি, মানুষের বিশ্বাস আর ইসলামী শিক্ষার আলোচনার একটি উপলক্ষ। আর বদরের শিক্ষাও কোনো একটি যুদ্ধের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ঈমান, ত্যাগ, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর সাহায্যের ওপর অবিচল আস্থার এক চিরন্তন পাঠ। কারণ প্রকৃত শিফা কোনো কূপের পানিতে নেই—শিফা আল্লাহর হাতে।