মক্কার মসজিদুল হারামের পর ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম মসজিদ মদিনার মসজিদে নববী। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিজ হাতে গড়া এই মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়, ইসলামি ইতিহাস ও সভ্যতার সূতিকাগারও বটে। প্রতিবছর হজ ও ওমরাহ পালনে যাওয়া লাখো মুসল্লি জিয়ারত করেন এই পবিত্র স্থান।    

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পরপরই নবীজি (সা.) মসজিদ নির্মাণে মনোযোগ দেন। মদিনার দুই এতিম বালক সাহল ও সুহাইলের কাছ থেকে দশ দিনারের বিনিময়ে জমি কেনা হয় ঠিক সে স্থানে, যেখানে তাঁর বাহন উষ্ট্রী কাসওয়া থমকে দাঁড়িয়েছিল। কাঁচা ইট, খেজুর ডাল ও গাছের কাণ্ড দিয়ে সাত মাসে তৈরি হয় প্রায় ৩৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩০ মিটার প্রস্থের এক সাদামাটা স্থাপনা, আয়তনে যা ছিল প্রায় ১,০৫০ বর্গমিটার। শুরুতে নামাজের দিক ছিল জেরুজালেমমুখী; পরে কিবলা বদলে কাবামুখী করা হলে বদলে যায় মসজিদের মূল অভিমুখও। মসজিদ-সংলগ্ন গড়ে ওঠে নবী-পত্নীদের বাসগৃহ। পরবর্তীতে এসব ঘরের একটিতেই— আয়েশা (রা.)-এর কক্ষে— নবীজিকে দাফন করা হয়, যা কালক্রমে মসজিদের অংশে পরিণত হয়। গৃহহীন মুহাজির মুসলমানদের আশ্রয়স্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই মসজিদ।  

গুরুত্ব ও ফজিলত

মক্কার কাবাঘরের পরই মসজিদে নববীর মর্যাদা। হাদিসে এসেছে, এই মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্য যেকোনো মসজিদে এক হাজার নামাজ আদায়ের সমান সওয়াব মেলে। বিশেষ সওয়াবের আশায় যে তিনটি মসজিদে সফর করার কথা হাদিসে এসেছে, মসজিদে নববী তার একটি— বাকি দুটি মসজিদুল হারাম ও বায়তুল মুকাদ্দাস। নবীজির ঘর ও মিম্বারের মাঝের ছোট্ট জায়গাটিকে তিনি নিজেই আখ্যা দিয়েছেন জান্নাতের একটি বাগান হিসেবে, যা রিয়াদুল জান্নাহ নামে পরিচিত। মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীকে একত্রে বলা হয় হারামাইন বা দুই পবিত্র মসজিদ।  

উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ

খাইবার যুদ্ধের পর সপ্তম হিজরিতে নবীজি নিজেই মসজিদ প্রস্থে চল্লিশ ও দৈর্ঘ্যে ত্রিশ হাত বাড়িয়ে প্রথম সম্প্রসারণ করেন, তাতে আয়তন দাঁড়ায় প্রায় আড়াই হাজার বর্গমিটার। এরপর ১৭ হিজরিতে খলিফা ওমর ও ২৯ হিজরিতে খলিফা ওসমান (রা.)-এর আমলে আরও দুই দফা সম্প্রসারণ হয়। ৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের নির্দেশে বড় ধরনের সংস্কার হয়, আয়তন বেড়ে হয় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বর্গমিটার; তখনই প্রথম মিনার ও নির্দিষ্ট মেহরাব যুক্ত হয় এবং নবী-পত্নীদের ঘর মসজিদের সীমানায় চলে আসে। মামলুক আমলে রওজা মোবারকের ওপর প্রথম গম্বুজ নির্মিত হয়; উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের সময় ১৮১৭ সালে সেই গম্বুজ পায় সবুজ রং, যা আজও মসজিদের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক। উসমানি আমলেই সুলতান আবদুল মজিদ মসজিদ সংস্কার করে আয়তন দশ হাজারের বেশি বর্গমিটারে নেন এবং যোগ করেন নতুন দরজা ও গম্বুজ। ১৯০৯ সালে এই মসজিদের মাধ্যমেই গোটা আরব উপদ্বীপে বিদ্যুতায়নের সূচনা ঘটে। সৌদি যুগে বাদশাহ আবদুল আজিজ ১৯৫০-এর দশকে মসজিদ ষোলো হাজার বর্গমিটারের বেশি সম্প্রসারণ করে চার কোণে বাহাত্তর মিটার উঁচু মিনার বসান। ১৯৭৪ সালে বাদশাহ ফয়সাল পশ্চিম পাশে চল্লিশ হাজারের বেশি বর্গমিটার যুক্ত করেন, আর ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত চলা বাদশাহ ফাহাদের সম্প্রসারণে আয়তন আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবশেষ ও সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ শুরু হয় বাদশাহ আবদুল্লাহর হাতে ২০১২ সালে; ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে মসজিদ একসঙ্গে প্রায় আঠারো লাখ মুসল্লির ধারণক্ষমতা অর্জন করে।  

গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ

মসজিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান রওজা মোবারক, যেখানে নবীজির পাশাপাশি শায়িত আছেন তাঁর দুই সঙ্গী আবু বকর ও ওমর (রা.)। এর ওপরের সবুজ গম্বুজ দূর থেকেই দৃষ্টি কাড়ে। রওজা মোবারক ও মিম্বারের মধ্যবর্তী রিয়াদুল জান্নাহকে বাকি মসজিদের লাল কার্পেট থেকে আলাদা করা যায় তার সবুজাভ কার্পেটের মাধ্যমে। এখানে নামাজ পড়তে প্রতিদিন সারিবদ্ধ হন হাজারো মুসল্লি। এই অংশেই আছে ইতিহাসখ্যাত কয়েকটি স্তম্ভ বা উস্তুওয়ানা, যার একটি উস্তুওয়ানাতুত তাওবাহ—যেখানে সাহাবি আবু লুবাবা (রা.) নিজেকে বেঁধে রেখে তওবা করেছিলেন। মূল মিম্বারটি প্রথমে ছিল খেজুর কাঠের তিন ধাপের সিঁড়ি, যেখান থেকে নবীজি খুতবা দিতেন। নবীজির যুগের নিঃস্ব সাহাবিদের আবাসস্থল আসহাবে সুফফা এবং একাধিক ঐতিহাসিক মেহরাবও সংরক্ষিত আছে মসজিদ চত্বরে। প্রবেশের জন্য আছে চল্লিশের বেশি দরজা, এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো বাবে সালাম নির্মিত হয় খলিফা ওমরের আমলে, আঠারো হিজরিতে। আধুনিক যুগে যুক্ত হওয়া বাবে ফাহাদসহ বিশাল সব প্রবেশপথ আর চার কোণের উঁচু মিনার রাতের মদিনার আকাশে যোগ করে আলাদা মাত্রা।  

বর্তমান অবস্থা

আজকের মসজিদে নববী কেবল ইবাদতখানা নয়, আধুনিক স্থাপত্যেরও এক বিস্ময়। নবীজির আমলের সেই ছোট্ট স্থাপনা থেকে বেড়ে মূল ভবনের আয়তন এখন প্রায় ছয় লাখ পনেরো হাজার বর্গমিটার, আর আঙিনাসহ মোট এলাকা ছাড়িয়ে গেছে দশ লাখ বর্গমিটার। শ্বেতপাথরের মেঝে, খুলে যাওয়া সাতাশটি চলন্ত গম্বুজ, আর জার্মান স্থপতি মাহমুদ বোদো রাশের নকশায় ২০১০ সালে বসানো ২৫০টি দ্বিস্তরবিশিষ্ট স্বয়ংক্রিয় ছাতা— যা সব মিলিয়ে সোয়া লাখ বর্গমিটারের বেশি এলাকায় ছায়া দেয়— মুসল্লিদের রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা ও শীতাতপ ব্যবস্থার স্বস্তি নিশ্চিত করে। ১০৪ মিটার উঁচু মিনারসহ মোট দশটি মিনার, ছাদে ওঠার স্বয়ংক্রিয় সিঁড়ি, একটি সুবিশাল গ্রন্থাগার আর প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রতিদিন সেবা দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের। সাধারণ সময়ে প্রায় দশ লাখ এবং হজ-রমজান মৌসুমে আরও বেশি মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন এখানে। ভিড় সামলাতে রওজা মোবারক জিয়ারত ও রিয়াদুল জান্নাহয় নামাজের জন্য এখন নুসুক অ্যাপে আগেভাগে সময় নিতে হয়। মদিনার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ তাই আজও মুসলিম উম্মাহর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অনন্য ঠিকানা।  

চৌদ্দশ বছর পেরিয়ে গেলেও মসজিদে নববীর সেই একই টান আজও অমলিন। দূর দেশ থেকে উড়ে এসে যে মুসল্লি প্রথমবার সবুজ গম্বুজের নিচে দাঁড়ান, তাঁর চোখ ভিজে ওঠে নিজের অজান্তেই; রিয়াদুল জান্নাহর সবুজাভ গালিচায় দুই রাকাত নামাজ শেষে নবীজিকে সালাম জানানোর মুহূর্তটি অনেকের কাছে থেকে যায় জীবনের সবচেয়ে প্রশান্তিময় স্মৃতি হয়ে। কাঁচা ইট আর খেজুর ডালের সেই সাদামাটা শুরু থেকে আজকের এই বিশাল স্থাপত্য —মসজিদে নববী কেবলই একটি ভবন নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুসলিম হৃদয়ে বয়ে চলা এক অবিচ্ছিন্ন ভালোবাসার নাম, যার টানে মানুষ ছুটে আসে বারবার, আর ফিরে যায় এক প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে।