ইঞ্জিন বন্ধ গাড়ি নিজে নিজেই চড়াই বেয়ে উঠে যাচ্ছে—ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও মদিনার কাছে একটি নির্দিষ্ট সড়কে এমন অভিজ্ঞতাই মেলে। সৌদি আরবের মদিনা শহর থেকে আনুমানিক ৩০–৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই পাহাড়ঘেরা উপত্যকার আসল নাম ‘ওয়াদি আল-বায়দা’; তবে লোকমুখে এটি পরিচিত ওয়াদি আল-জিন বা ‘জিন পাহাড়’ নামে।

জায়গাটির খ্যাতি মূলত এই অদ্ভুত ঘটনাকে ঘিরেই। ২০০৯–১০ সালের দিকে সেখানে সড়ক নির্মাণের সময় রোলার ও ভারী যন্ত্রপাতি নিজে থেকেই ঢাল বেয়ে মদিনার দিকে চলতে শুরু করে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পরবর্তীতে গাড়ি কিংবা পানির বোতল ‘উঁচু’ দিকে গড়ানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে এটি ওমরাহযাত্রী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক জনপ্রিয় আকর্ষণে পরিণত হয়।

ইসলামে জিন জাতির অস্তিত্ব অনস্বীকার্য—পবিত্র কুরআনের একটি পূর্ণ সূরার নামই 'আল-জিন'। কিন্তু এই নির্দিষ্ট পাহাড়ে জিনদের কোনো বিশেষ কর্মকাণ্ড রয়েছে, কিংবা তারাই গাড়ি চালায়—এমন দাবির সপক্ষে কুরআনের কোনো আয়াত বা সহিহ হাদিসের দলিল নেই। এমনকি ২০২০ সালে মদিনা রিজিওন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপত্যকায় অতিপ্রাকৃত কোনো অস্তিত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ফলে এই মুখরোচক গল্পকে ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।

 
তাহলে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা কী? ভূবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘গ্র্যাভিটি হিল’ বা দৃষ্টিবিভ্রম। চারপাশের অসম পাহাড় ও দিগন্তরেখার বিন্যাস মানুষের চোখকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করে যে, বাস্তবে নিচের দিকে ঢালু রাস্তাকেও চড়াই বলে ভ্রম হয়। ওয়াদি আল-বায়দা নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সড়কটির ঢাল নিচের দিকে গড়ে প্রায় ২.৬ শতাংশ। ফলে নিউট্রালে থাকা গাড়ি আসলে স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণের টানেই নিচের দিকে গড়ায়—শুধু পারিপার্শ্বিক ভূমিরূপের কারণে আমাদের চোখ তাকে ‘উঁচুতে ওঠা’ বলে ভুল ব্যাখ্যা করে। উল্লেখ্য, পৃথিবীতে  এমন স্থান আরও অনেক রয়েছে।

এই লোকশ্রুতির চেয়েও অর্থবহ সত্য কুরআনেই বর্ণিত আছে। সূরা আল-জিনে যেমন নাখলা প্রান্তরে একদল জিনের কুরআন শুনে ঈমান আনার বিবরণ রয়েছে, তেমনি সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী ‘জিনের রাতে’ নবীজি (সা.) স্বয়ং তাদের কাছে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত ও কুরআন তিলাওয়াত শোনান।

ইসলামে জিনের জগৎ বাস্তব হলেও, তা বোঝার ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদিসের দলিলের পথেই হাঁটা আবশ্যক। দৃষ্টিভ্রমের এই বিস্ময়কে অস্বীকার করা যেমন অনুচিত, তেমনই লোককথাকে আকিদার অংশ বানানোও সংগত নয়—প্রকৃতির অদ্ভুত রহস্যের ভেতর দিয়ে পরম স্রষ্টার কুদরত উপলব্ধি করাই হোক আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।