আচ্ছা, একটু থামো। নিজের দিকে একবার তাকাও।
তোমার হাতে টাকা আছে, শরীরে শক্তি আছে, পথ খোলা আছে—তবু বছরের পর বছর গড়িয়ে যায়, আর তুমি একবারও ওই পবিত্র ঘরের পানে পা বাড়াও না। মনে মনে বলো—‘হয়ে যাবে, সামনের বছর... আরেকটু গুছিয়ে নিই।’ কী আশ্চর্য! আজ কত মানুষ হজ্বের পূর্ণ সামর্থ্য বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, অথচ নিয়্যতটুকুও করে না, সংকল্পটুকুও বাঁধে না, এক পা এগোনোর তাড়াটুকুও অনুভব করে না।
অথচ শোনো, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের ভিতটাই গেঁথে দিয়েছেন পাঁচটি স্তম্ভের ওপর:
«بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ...»
—“ইসলাম নির্মিত হয়েছে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর...”—আর তারই একটি হলো বাইতুল্লাহর হজ্ব। (বুখারী ও মুসলিম) ভাবো তো, যে হজ্ব ছাড়া তোমার দ্বীনের ইমারতটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়, সেটাকে তুমি ‘পরে’-র ঝুড়িতে ফেলে রেখেছ!
আর আল্লাহ তাআলা কেমন গম্ভীর ভাষায় ডাকছেন, একবার কান পেতে শোনো:
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ
—“আল্লাহর জন্য মানুষের ওপর ওই ঘরের হজ্ব করা ফরয—তার ওপর, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে। আর যে কুফরি করল, তবে নিশ্চয় আল্লাহ সমগ্র জগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী।” (আলে ইমরান: ৯৭)
দেখলে, কেমন ভয়ংকর এক ইঙ্গিত! হজ্ব ফরয হওয়ার কথার ঠিক পরেই—কুফরের কথা। যেন আল্লাহ বলছেন—তুমি না গেলে আমার কী? ক্ষতিটা তো তোমারই, হে অসহায় বান্দা!
আর একটু গভীরে তাকাও—কেমন এক ভাষার মিল! আয়াতে আল্লাহ বললেন وَمَنْ كَفَرَ; আর একটি যয়ীফ রেওয়ায়েতে যেন বাজে সেই একই ধমকের সুর -
«مَنْ مَلَكَ زَادًا وَرَاحِلَةً تُبَلِّغُهُ إِلَى بَيْتِ اللَّهِ وَلَمْ يَحُجَّ، فَلَا عَلَيْهِ أَنْ يَمُوتَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا»
—“যার কাছে বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার মতো পাথেয় ও বাহন আছে, অথচ সে হজ্ব করল না, তার ইহুদি বা খ্রিস্টান হয়ে মরায় কোনো বাধা নেই।” (তিরমিযী)¹
আর দেখো, ফারূকে আযম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অন্তরও এই একই আগুনে পুড়ছিল। তিনি বলে উঠেছিলেন:
«مَنْ أَطَاقَ الْحَجَّ فَلَمْ يَحُجَّ... مَا هُمْ بِمُسْلِمِينَ، مَا هُمْ بِمُسْلِمِينَ»
—“যে হজ্বের সামর্থ্য রাখে, অথচ হজ্ব করে না... তারা মুসলিম নয়, তারা মুসলিম নয়!”²
লক্ষ করো—তিন জায়গাতেই একই ভাষা: আয়াতে ‘কুফর’, হাদীসে ‘ইহুদি-খ্রিস্টানের ন্যায় মৃত্যু’, আর উমর রা.-এর জবানে ‘মুসলিম নয়’। যেন তিনটি কণ্ঠ একই সুরে গর্জে উঠছে সামর্থ্যবান হজ্বত্যাগীর দুয়ারে। (মনে রেখো, এই কঠোর শব্দগুলো হাকীকী তাকফীর নয়, বরং তীব্র ধমক ও হুঁশিয়ারি—এতটাই ভয়ংকর এই গাফলতি!)
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে সরল ফরমান শোনালেন:
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قَدْ فَرَضَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ الْحَجَّ فَحُجُّوا»
—হে মানুষ! আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ্ব ফরয করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ্ব করো।” (মুসলিম) ফরয করেছেন—তাই করো। মাঝখানে ‘দেখি’, ‘পরে’, ‘সামনের বছর’—এসব ওজরের কোনো জায়গা নেই।
তাই তো প্রিয়নবী নিজেই আমাদের তাড়া দিয়ে গেছেন, যেন এক মুহূর্তও নষ্ট না করি:
«مَنْ أَرَادَ الْحَجَّ فَلْيَتَعَجَّلْ، فَإِنَّهُ قَدْ يَمْرَضُ الْمَرِيضُ، وَتَضِلُّ الضَّالَّةُ، وَتَعْرِضُ الْحَاجَةُ»
—“যে হজ্বের ইচ্ছা করে, সে যেন দ্রুত করে ফেলে; কেননা মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, বাহন হারিয়ে যেতে পারে, আর নানা প্রয়োজন সামনে এসে দাঁড়াতে পারে।” (আবু দাঊদ; হাদীসটি হাসান)
সুবহানাল্লাহ! এই হাদীসটাই যেন তোমার-আমার গল্প বলে দিচ্ছে। তুমি কী জানো, আগামীকাল তোমার জন্য কী লেখা আছে? কে বলে দিয়েছে, সামনের হজ্বের মৌসুম পর্যন্ত তুমি বেঁচে থাকবে? হতে পারে এর আগেই মৃত্যু দুয়ারে দাঁড়াবে। হতে পারে কোনো অসুখ এই শক্ত শরীরটাকে বিছানায় শুইয়ে দেবে। হতে পারে এমন কোনো প্রয়োজন এসে হাজির হবে, যা তোমার সব সঞ্চয় শুষে নেবে। হতে পারে তোমার আর কাবার মাঝখানে এমন এক দেয়াল উঠবে, যা আজ কল্পনাও করতে পারো না।
আর ভেবে দেখো, কী অপূর্ব পুরস্কার তুমি ফেলে রেখে যাচ্ছ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«وَالْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ»
—“আর কবুল হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” (বুখারী ও মুসলিম)
একদিকে জান্নাতের হাতছানি, অন্যদিকে ওই কঠিন ওয়ীদ—তবু ‘পরে, পরে’ বলে সময় পার করছ! জেনে রাখো, এই ‘পরে’ শয়তানের এক ভয়ানক ফাঁদ, যাতে কত সামর্থ্যবান বান্দা হজ্ব ছাড়াই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে।
তাই বলি, ভাই আমার—এখনই। সামর্থ্য যখন হাতে ধরা দিয়েছে, আর দেরি কোরো না। ভেতরের ওই কণ্ঠটাকে চুপ করিয়ে দাও, যে বারবার বলে ‘পরে’।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে হজ্বের সেই আকুলতা জাগিয়ে দাও, যা আর কোনো ওজরকে টিকতে দেয় না। আর সামর্থ্য থাকতে থাকতেই তোমার ঘরের চৌকাঠে আমাদের কপাল ঠেকানোর তাওফীক দাও। আমীন।